বিসিকাতাল বিতর্ক-১৯ঃ "ত্রিপুরা নববর্ষ সম্পর্কে 'স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান' যা বলে
আমি শতভাগ নিশ্চিত যে, বর্তমানে বিশ্বের ৯৯% তিপ্রা জানেন না, স্বাধীন ত্রিপুরা রাষ্ট্রের নিজস্ব পবিত্র সংবিধান ছিল। এটা জানার কথাও না, কারণ ১৯৪৯ সালের ১৫ই অক্টোবরে ভারত ইউনিয়নে যোগদানের পরপরই স্বাধীন ত্রিপুরার সব ধরনের রাষ্ট্রীয় নিশান তছনছ করে, ধ্বংস করে ফেলা হয়। এমনকি পাঠ্য বইয়ের সিলেবাস থেকেও "ত্রিপুরা রাজ্যের ইতিহাস" চিরতরে মুছে ফেলা হয়।
ভাগ্যক্রমে রাষ্ট্রীয় নিশানের সামান্য অংশ কিছু মহান ব্যক্তিদের কাছে রক্ষিত থেকে যায়। পরে সেসব রাষ্ট্রীয় নিশান বিভিন্ন জনের হাত ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। এরকমই একটি রাষ্ট্রীয় নিশান হচ্ছে, "THE CONSTITUTION OF INDEPENDENT TRIPURA", যার একটা কপি বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরার কাছে পৌঁছে যায়। তিনি তাঁর গবেষনাকর্মের মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে "ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি" নামের একটি ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশ করেন। আর এই গ্রন্থের মধ্য দিয়েই তিনিই সর্বপ্রথম পবিত্র ত্রিপুরা সংবিধানটির বিষয়ে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। তাঁর এরূপ মূল্যবান গবেষণাকর্মের প্রতি স্বীকৃত স্বরূপ 'বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ' ২০১৪ সালে তাঁকে 'Bangla Academy Literary Award' প্রদান করে।
গবেষক প্রভাংশুর "ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি" গ্রন্থটি বহুল আলোচিত, সমাদৃত এবং সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম। আমি এমনও কথা শুনেছি, বাংলাদেশের জনৈক সেনা অফিসার যখন লাইব্রেরীতে গিয়ে এই গ্রন্থটি আবিষ্কার করলেন, তখন সেই লাইব্রেরীতে থাকা সেই গ্রন্থের সবগুলো কপি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
কাজেই, একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, যেসকল তিপ্রাদের ভাগ্যক্রমে সেই দুর্লভ গ্রন্থটি কেনার সুযোগ হয়েছে কিংবা পড়ার সুযোগ হয়েছে, তারাই সেই ১% ভাগ্যবান তিপ্রা। এতে করে আমি নিশ্চিত যে, তারা অবশ্যই গ্রন্থের "THE CONSTITUTION OF INDEPENDENT TRIPURA 1351 TE (1941 AD)" -এই অধ্যায়টি পড়েছেন এবং তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ত্রিপুরাব্দের ১লা বৈশাখই (১৪ই এপ্রিল) হচ্ছে ত্রিপুরা রাজ্যের এবং ত্রিপুরা/তিপ্রা জাতির 'বিসিকাতাল' তথা 'নববর্ষ'।
এবার আসি, ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জি সম্পর্কে "THE CONSTITUTION OF INDEPENDENT TRIPURA" তথা পবিত্র ত্রিপুরা সংবিধানে যেসকল তথ্য রয়েছেঃ-
১. সংবিধানের পূর্বনির্ধারিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে: "সংবিধান গঠনের জন্য রাজকীয় ঘোষণাটি ১ লা বৈশাখ, ১৩৯৯ টি.ই। (14th April, 1939 AD), which was the new year’s day in the state according to the Tripura Era, must be regarded as a red letter day in its annals." - এরূপ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, ত্রিপুরাব্দের ১লা বৈশাখেই (১৪ই এপ্রিল) ত্রিপুরা রাজ্যে "বর্ষবরণ" উৎসব পালন করা হয়।
2. মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য ১৩৪৯ ত্রিপুরাব্দে (1939-40 AD) পুরো বছর জুড়ে যতগুলো রাষ্ট্রীয় ঘোষণা ও আদেশ দিয়েছিলেন, সেসবই পবিত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মহারাজার প্রথম রাষ্ট্রীয় ঘোষণা ছিল "1st Baishakh - 14th April" তারিখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য করে ত্রিপুরা নববর্ষ (New Year’s Day) পালন। অর্থাৎ সেই ৫৯০ সালে মহারাজা জুজারুফার প্রবর্তিত ত্রিপুরাব্দের প্রথম বছর থেকে তিপ্রা জাতি 'বৈসু উৎসব' কেন্দ্রিক যে নববর্ষ উৎযাপন করে আসছিলো, সেটাই রাষ্ট্রীয় সংবিধানে নথিভুক্ত করা হল। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
3. মহারাজার রাষ্ট্রীয় ঘোষণাপত্রে "1.1.49 T.E" তথা "1st Baisakh, 1349 T.E" উল্লেখিত তারিখ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, ত্রিপুরাব্দ বছরের শুরু হয় শকাব্দ তথা বৈদিক মাসের ১লা বৈশাখে তথা গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের এপ্রিল মাসের মধ্যভাগে।
4. মহারাজার রাষ্ট্রীয় আদেশে উল্লেখিত "9.2.49 T.E" তথা "9th Jaistha 1349 T.E." উল্লেখিত তারিখ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, শকাব্দ তথা বৈদিক মাস জ্যৈষ্ঠ হচ্ছে ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জিকার দ্বিতীয় মাস।
5. 20.3.51 T.E. তারিখে মহারাজা বীর বিক্রম এক রাষ্ট্রীয় আদেশ (Order No. 997 (Camp)) প্রদান করেন, যা 1.4.51 T.E. তারিখে রাষ্ট্রীয় গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। সেই Order No. 997 (Camp) -এ ঊল্লেখ আছে: "Where in my New Year’s Day Proclamation of 1349 T.E.কিছু প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণায় আমি আমার প্রিয় মানুষকে ভবিষ্যতে ত্রিপুরা সরকার পরিচালিত হবে এমন একটি লিখিত সংস্থার প্রাথমিক অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।
6. মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের আরেকটি আদেশনামায় ত্রিপুরাব্দের দুইটি বছরের দুইটি তারিখ উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ ২৫শে চৈত্র, ১৩৫২ ত্রিপুরাব্দ এবং ১লা বৈশাখ, ১৩৫৩ ত্রিপুরাব্দ। তারিখ দুইটি বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বৈদিক মাস চৈত্র হচ্ছে ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জির শেষ মাস এবং বৈশাখ হচ্ছে ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস।
উপরোক্ত সকল তথ্যাদি প্রমাণ করে যে, ২২শে ডিসেম্বর নয়, বরং ১লা বৈশাখই হচ্ছে ত্রিপুরাব্দের বর্ষবরণ উৎসব।
আমার মনে হয়, যারা ২২শে ডিসেম্বর ভিত্তিক "ত্রিং ক্যালেন্ডার" বের করার পক্ষে মত দিয়ে থাকেন কিংবা "Tring Festival" পালনের পক্ষে, তারাও হয়তো আজও জানেন না, আমাদের একটা পবিত্র সংবিধান ছিল, যেটি ৬৯ বছর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে।
২২শে ডিসেম্বর ভিত্তিক "ত্রিং ক্যালেন্ডার" প্রবর্তনের অন্যতম উদ্যোক্তা, শ্রী বিনয় দেববর্মা স্যার বোধয় "স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান" সম্পর্কে আদতে কিছু জানেন না। কারণ, তাঁর লেখা 'THE HISTORICAL BACKGROUND OF TIPRA ERA' বইয়ে "স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান" বিষয়ে কোন তথ্যই উল্লেখ নেই। এমনকি 'কক ত্রিপুরা' চ্যানেলে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে "স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান" বিষয়ে কিছুই বলেননি। অথচ তিনি নিজেই বলেছেন যে, তিনি ত্রিপুরাব্দের ইতিহাস বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা করেছেন।
বিনয় স্যার যদি সত্যিই ত্রিপুরাব্দের ইতিহাস বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করে থাকেন, তাহলে "স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান" বিষয়ে এবং সংবিধানে উল্লেখিত "ত্রিপুরা নববর্ষ" পালন বিষয়ে তিনি তাঁর গ্রন্থে এবং সাক্ষাৎকারে তুলে ধরতে পারতেন। এতে করে পাঠক সমাজ "ত্রিপুরা নববর্ষ" পালন বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার সুযোগ পেতেন। এ থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, তিনি "স্বাধীন ত্রিপুরা সংবিধান" বিষয়ে মোটেই অবগত নন। আর যদি অবগত হয়ে থাকেন, তাহলে বলতে দ্বিধা নেই যে, তিনি ইচ্ছা করেই এসব ইতিহাস এড়িয়ে গেছেন।
তবে, আমার মনে হয়, স্বয়ং বর্তমান মহারাজা তথা রাজপরিবারের কাছেও স্বাধীন ত্রিপুরার সেই পবিত্র সংবিধানটি সংরক্ষিত নেই। কেননা যদি সংরক্ষিত থাকতো, তাহলে মহারাজা প্রদ্যুৎ তাঁর সম্পাদিত "The North-East Today" পত্রিকায় কখনই বলতেন না যে, "বিতর্কটি এখনও চলছে ‘Tring’ or Tripura বা ত্রিপুরা যুগ নতুন বছর 14/15 এপ্রিল বা 22 ডিসেম্বর।
এক্ষেত্রে মহারাজাকে খুব একটা দায়ী করা যায় না। আসল দায়ী হচ্ছে তারাই, যারা ষড়যন্ত্র করে ত্রিপুরার স্বাধীনতাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। "কক ত্রিপুরা" চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাকারে মহারাজা প্রদ্যুৎ বিক্রম কিশোর মাণিক্য বলেছিলেন।
মহারাজাকে সরিয়ে যারা মুখ্যমন্ত্রী আনলেন, এমপি আনলেন, ২০ এমএলএ আনলেন, আজ তারাই মহারাজার ভূমিকা পালন করুন।"
আসলে তো তাই। আমরা যদি সকলেই স্বীকার করি যে, তিপ্রা জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মহারাজা হচ্ছেন বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য; তাহলে তাঁর রেখে যাওয়া নথিপত্র, বিশেষ করে তাঁর প্রবর্তিত সংবিধানে ঘোষিত ও নথিভুক্ত অনুসারে - ত্রিপুরাব্দের ১লা বৈশাখে (১৪ই এপ্রিল) ত্রিপুরা/তিপ্রা জাতির 'বিসিকাতাল' তথা 'নববর্ষ' উৎযাপনকে অস্বীকার করা আমাদের কোনমতেই উচিত নয়। বরং মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য ও মহারাজার জুজারুফার প্রতি সম্মান রেখেই আমাদের সকলেরই উচিত হবে সেই ৫৯০ সালে ত্রিপুরাব্দের প্রথম বছর থেকে পালিত হয়ে আসা বৈসু উৎসব (৩ দিন- হারি বৈসু, বৈসু মা, বিসি কাতাল) কেন্দ্রিক বর্ষবরণকে পুনরায় পূর্ণোদ্দমে পালন করা।
